উত্তরে বাস চলছে ঢিমেতালে দক্ষিণের ৯ জেলায় ধর্মঘট অব্যাহত,

প্রকাশিত: ২১শে নভেম্বর ২০১৯ ০৫:৫৫:৫৯ | আপডেট: ২১শে নভেম্বর ২০১৯ ০৫:৫৫:৫৯ 10
উত্তরে বাস চলছে ঢিমেতালে দক্ষিণের ৯ জেলায় ধর্মঘট অব্যাহত,

খুলনা বিভাগসহ দক্ষিণের ৯ জেলায় বাস ধর্মঘট প্রত্যাহার হয়নি। ফলে যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চাপ বেড়েছে ট্রেনগুলোতে। তবে ট্রেনের টিকিট না পেয়ে অনেকে হতাশ হয়ে রেলস্টেশন থেকে ফিরে যাচ্ছেন। তবে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাঙ্কলরি চলাচল করতে দেখা গেছে। এদিকে বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও রাজশাহী, বগুড়াসহ উত্তরের কয়েকটি জেলায় বৃহস্পতিবার বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। রংপুর, গাইবান্ধা, দক্ষিণাঞ্চলের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন রুটের পরিবহন রাজশাহীতে আসছে না। বগুড়া থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলা রুটগুলোতে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে অল্প কিছু বাস বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় দেখা গেছে। সমকালের ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় খুলনার সোনাডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকাসহ কোনো রুটেই বাস চলাচল করছে না। টার্মিনালে পাঁচ শতাধিক বাস পড়ে আছে। চালক ও হেলপাররা অলস সময় কাটাচ্ছেন। সকাল ১১টায় খুলনা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখা যায়, চারটি প্ল্যাটফর্মে কয়েকশ' যাত্রী অপেক্ষা করছেন। সকাল ১১টায় নির্ধারিত সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশে মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যায়। সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে চিত্রা এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলে তখন পর্যন্ত ট্রেন প্লাটফর্মে আসেনি। নির্ধারিত সময়ের সাড়ে তিন ঘণ্টা পর ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সাব্বির শেখ নামের এক যুবক বলেন, তিনি শুক্রবার ঢাকায় যাবেন। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পাননি। এখন বাস ধর্মঘটের মধ্যে কীভাবে যাবেন বুঝতে পারছেন না। খুলনা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার জানান, বাস ধর্মঘটের কারণে ট্রেনে যাত্রীসংখ্যা অনেক বেড়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার পর সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ ও সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কে কয়েকটি যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু করলেও দুপুর ১২টার দিকে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিআরটিসির বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। সকালে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকাগামী কয়েকটি পরিবহনও ছেড়ে গেছে। বাস চলাচল না করায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। ইজিবাইক, মাহিন্দ্র, ইঞ্জিনভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে তারা যাতায়াত করছেন। বাস ধর্মঘটের কারণে এসব যানবাহনে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে। ট্রাক ঠিকমতো না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের দ্বিগুণ খরচে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে।

মেহেরপুরে ট্রাক চলাচল করলেও এখনও আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন চালকরা। জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল বলেন- প্রশাসন, মালিক-শ্রমিক মিলে বৈঠক করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা চলছে। মাগুরায় পঞ্চম দিনের মতো চলা ধর্মঘটে নাকাল চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। কারণ দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় ইজিবাইক, সিএনজি, টেম্পোতে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। তবে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় যৌথসভা শেষে সব ধরনের যানবাহন চালানোর ঘোষণা দেন কুষ্টিয়ার বাস মালিক ও শ্রমিক নেতারা। এরপর দুপুর আড়াইটার পর থেকে বাস চলাচল শুরু হলে স্বস্তি মেলে যাত্রীদের। বাস মিনিবাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আজগর আলী বলেন, 'সভা শেষে বাস চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাসও সড়কে নেমেছে। আর কোনো সমস্যা থাকবে না ইনশাল্ল্লাহ।' বাগেরহাটের অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্কার রুটগুলোতে বাস চলাচল করছে, তবে সংখ্যায় কম।

যশোরের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনেও যশোরের কোনো রুটে বাস চলাচল করেনি। এই ভোগান্তির মধ্যেই এদিন শুরু হয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষা। ধর্মঘটের কারণে আবেদনকারীদের ১০ ভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। সারাদেশের ৪৩ হাজার ছেলেমেয়ে এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, অসহনীয় দূর্ভোগ ও ঝুঁকি নিয়ে তাদের যশোরে আসতে হয়েছে।

যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশিদ বাচ্চু জানান, শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছে। শ্রমিক ইউনিয়ন বা ফেডারেশন কোনো কর্মসূচি দেয়নি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজবাড়ীর শ্রীপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই বাস ও ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে। শ্রমিকরা কেউ বাসের মধ্যে শুয়ে আছেন, কেউ খোশগল্পে মত্ত। নিরুপায় যাত্রীরা অটোরিকশা, মাহিন্দ্র, নছিমনে করে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন। জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হাসান মৃধা জানান, শ্রমিকরা কেউ নেই। গাড়ি চলবে কীভাবে। তার পরও একটি-দুটি করে বাস চালাতে চেষ্টা করছেন। আশা করছি শুক্রবার থেকে পুরোদমে পরিবহন চলাচল শুরু হবে।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহী-ঢাকা, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী-নওগাঁ রুটে বাস ও ট্রাক ছেড়ে গেছে। তবে উত্তরের রংপুর, গাইবান্ধা, দক্ষিণাঞ্চল থেকে কোনো বাস রাজশাহীতে আসছে না। ওইসব রুটে রাজশাহী থেকেও কোনো পরিবহন যাচ্ছে না। বাস কম থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তিও রয়েছে পথে পথে।

জেকে পরিবহনের সুপারভাইজার বলেন, আমরা নাটোর পর্যন্ত যাচ্ছি। রাজশাহী-নাটোর পর্যন্ত কোনো বাধা নেই। অন্য জেলায় বাস চলাচল শুরু হলে আমরাও যাওয়া শুরু করব। যাত্রীদের অভিযোগ- রাজশাহী-নাটোর রুটের ভাড়া আগে ৪০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হতো। এখন তারা চাইছে ৭০ টাকা। সব রুটেই ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে।

ট্রাক ও ট্যাঙ্কলরি পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও হিলি-দিনাজপুর ও হিলি-বগুড়া রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। গত ছয় দিনের এ অচলাবস্থার কারণে হিলি চেকপোস্টে বাংলাদেশ ও ভারতের পাসপোর্ট যাত্রীরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন। এ ছাড়া দিনাজপুর ও বগুড়াগামী যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হিলি চেকপোস্ট দিয়ে ভারত থেকে ফিরে আসা যাত্রী নাজমুল হকসহ অনেকে বলেন, বাংলাদেশে ঢুকেই জানতে পারি বাস চলাচলা বন্ধ রয়েছে। আমরা সিরাজগঞ্জ যাব। এখন বিপদে পড়েছি। বাড়ি যেতে বিকল্প উপায়ে অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। তাতে কয়েকগুণ ভাড়া গুনতে হবে।

বগুড়ার অর্ধশত রুটের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার গাবতলী ও সিরাজগঞ্জে বেশ কিছু বাস ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তবে জেলার অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলার অন্যান্য রুটে আগের মতোই বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বগুড়ায় বিভিন্ন রুটে প্রায় ৭০০ বাস চলাচল করে। তবে বিআরটিএ জানিয়েছে এসব বাসের প্রায় ৯০ শতাংশেরই ফিটনেস নেই। এমনকি চালকদেরও লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। ফলে নতুন সড়ক আইন কার্যকর হলে জেল-জরিমানা গুনতে হবে- এমন শঙ্কায় বগুড়ার পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় বাস নামাচ্ছেন না। বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামছুদ্দিন শেখ হেলাল অবশ্য দাবি করেছেন, নতুন আইন সংশোধনের আশ্বাসে বগুড়ার চালক-শ্রমিকরাও যানবাহন চালাতে শুরু করেছেন। তবে আগের অবস্থায় ফিরতে একটু সময় লাগবে।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )