ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ৭ বাধা

প্রকাশিত: ৫ই মার্চ ২০২০ ১২:৫৫:০২ | আপডেট: ৫ই মার্চ ২০২০ ১২:৫৫:০২ 1
ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ৭ বাধা

গত বছর অক্টোবরে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু প্রকট আকার ধারণ করে। প্রথমে ঢাকায় ও পরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঘুরে ফিরে সবাই এর দায় চাপায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওপর। দেশের অন্য সিটি করপোরেশনগুলোর দাবি, ঢাকার ব্যর্থতার কারণেই দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এবারও বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে।

তাদের মতে, থেমে থেমে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও একেবারে নির্মূল হয়নি ডেঙ্গু। জুন-জুলাইয়ে বৃষ্টি শুরু হলে আবারও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে। সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতির পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে জনসংখ্যার ঘনত্ব আর পরিবেশের কারণে ঢাকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বেশ দুরুহ ব্যাপার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব বাধা মোকাবিলা করতে না পারলে গত বারের চেয়ে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে ডেঙ্গু।

মেট্রোরেল: ঢাকার বিভিন্ন সড়কে মেট্রোরেলের কাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টি হলে এ বিশাল নির্মাণযজ্ঞের বিভিন্ন গর্তে পানি জমে থাকতে পারে। দ্রম্নত পানি অপসারণ না করলে এসব জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারে। তাই এ ব্যাপারে মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

পুরানো গাড়ি: ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্তত অর্ধশাধিক থানা রয়েছে। এসব থানায় বিভিন্ন পুরানো গাড়ি পড়ে থাকে। যেখানে এডিস মশার বংশ বিস্তারের উপযুক্ত জায়গা বলে পরিচিত।

বিআরটিসি বাস ডিপো, ট্রাফিক বিভাগের ডাম্পিং স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও গাড়ি মেরামতের জায়গায় অসংখ্য পুরানো গাড়ি ও গাড়ির বাতিলাংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে গাড়ির পুরানো টায়ারে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। এগুলো তেমন কেউ তদারকি করে না। সিটি করপোরেশনের মশক নিধনকর্মীরাও এসব স্থানে নিয়মিত ওষুধ স্প্রে করে না। ফলে সুযোগ পেলেই এসব জায়গা এডিস মশার অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। তাই বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই গুরুত্ব দিয়ে এসব গাড়ি পরিষ্কার করে যাতে আর পানি না জমে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নির্মাণাধীন ভবন : ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এসব ভবনে নির্মাণ কাজের সময় ব্যবহৃত পানি বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকে। তাছাড়া বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না ভবন মালিকরা। বিশেষ করে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানি এবং সরাকারি উদ্যোগে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার ভবন নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি গুরুত্ব দেয় না বলে অভিযোগ করেছেন সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভবন পরিদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

ছাদ বাগান ও বেইজম্যান্ট: আবাসিক ভবনের বেইজমেন্টে সাধারণত গাড়ি পার্ক করা হয়। অনেকেই এসব গাড়ি আবার ধুয়ামোছার কাজও করেন সেখানেই। গতবার ডেঙ্গু বিস্তারের পর সরকারি মনিটরিং সেলের সদস্যরা পুরান ঢাকার বেশকিছু বাসার বেইজমেন্টের কিনারায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন।

সবুজায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে কিছুদিন আগেও সবাইকে ছাদ বাগান করতে উৎসাহ দিয়েছে সিটি করপোরেশন। এমনকি ছাদে বাগন থাকলে বাড়ির মালিকের গৃহকরে ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দেন সিটি করপোরেশনের মেয়ররা। তবে নিয়মিত তদারকির অভাবে সেই ছাদ বাগানই নগরবাসীর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাদ বা বারান্দার ফুলের টবে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে।

জলাবদ্ধতা ও ড্রেন: একটু বেশি বৃষ্টি হলেই ঢাকার রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকে দীর্ঘ দিন। বৃষ্টির পর কম সময়ে পানি নিষ্কাশন করতে না পারলে এডিস বংশ বিস্তার করতে পারে। তাছাড়া মশার বংশ বিস্তার রোধে পুরানো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জলাশয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ঢাকার অরক্ষিত ও অপরিষ্কার জলাশয়গুলো মশা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এসব জলাশয়ে ভেসে থাকা ডাবের খোসা, চিপসের প্যাকেট, ওয়ান টাইম গস্নাস ও পানির বোতলে এডিস মশা ডিম পারতে পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পস্নাস্টিক আবর্জনায় পানি জমে থাকতে দেখা যায়।

জনসচেতনতা: এরই মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি করতে কাজ শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বিভিন্ন এলাকায় অ্যাডভোকেসি সভার মাধ্যমে তারা নাগরিকদের বোঝাতেই চাইছেন, যাতে কোনো অবস্থাতেই স্বচ্ছ পানি জমে না থাকে। বিশেষ করে ফ্রিজ, এসি ও ফুলের টবে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কারের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। ডাবের খোসা, বিভিন্ন ওয়ানটাইম সামগ্রী ও পরিত্যক্ত জিনিসপত্র যাতে যত্রতত্র ফেলে না রাখা হয়, সেজন্য নগরবাসীকে সচেতন হতে বলছেন করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এসব বাধা মোকাবিলার জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি অন্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোরও উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খাল ও ড্রেন মশার বংশ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর মূল নিয়ন্ত্রণক সংস্থা হলো ওয়াসা। গাড়ির ডাম্পিং স্টেশন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। বিআরটিএ'রও আলাদা নিয়ন্ত্রণক রয়েছে। সর্বোপরি ডেঙ্গু ও মশক নিয়ন্ত্রণে নাগরবাসী থেকে শুরু করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সেবাসংস্থাসমূহকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা যায়যায়দিনকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনার কোনো বিকল্প নেই। জনসচেতনতা তৈরি করতে প্রতিটি জোনে অ্যাডভোকেসি সভা করা হচ্ছে। পত্রিকা-টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনসহ প্রচারপত্র বিতরণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যেসব হোল্ডিংয়ে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে তাদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। তারা সচেতন না হলে পরবর্তীতে জরিমানা করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কীটতত্ত্ববিদদের নিয়ে সভা করা হয়েছে। সভা থেকে ঢাকা ওয়াসাসহ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সব সংস্থাকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগিরই এসব সংস্থার কাছে চিঠি পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অন্যন্য সংস্থাগুলোকেও সচেতন হতে অনুরোধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাতে রাজউক, রিহ্যাব ও ডিএমপিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে আরও দুই/তিন বার সচেতন করা হবে।

এরপরও সচেতন না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, এডিস মশার লার্ভা খুঁজতে মার্চ থেকে প্রতিদিন ৫০টি বাড়ি পরিদর্শন করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। প্রাথমিকভাবে কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তাদের সতর্ক করে লিফলেট দেওয়া হচ্ছে। এই কার্যক্রম সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চলবে। স্থাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ ৬টি ওয়ার্ডে মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রোগ্রাম চলছে। অন্য ওয়ার্ডগুলোতে মশক নিধনে সকাল-বিকাল রুটিন ওয়ার্ক চলছে বলে জানান তিনি।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )