নতুন দিনে নতুন স্বপ্ন নিয়ে

প্রকাশিত: ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:৫৯:০০ | আপডেট: ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৫:০০:১৭ 197
নতুন দিনে নতুন স্বপ্ন নিয়ে

ধ্রুপদি অর্থে সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমকে সময়ের বাহন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক মার্ক টোয়েন একে তুলনা করেছিলেন প্রতিদিনের সূর্যের সঙ্গে। তবে এটা যে নিছক সময়ের প্রতিফলন ঘটায় না, বরং পরিবর্তনের পথরেখা তৈরি করে, বাংলাদেশ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরে এদেশের সংবাদপত্র হয়ে উঠেছিল রাজপথের সহযোগী। সমকালও প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদেশের সব গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, জনমুখী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সারথি হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। সামাজিক দায়িত্বশীলতা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রেই আমরা সব সময় দৃষ্টি দিয়েছি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পত্রিকাটি পরিচিতি পেয়েছে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের জনসাধারণের আস্থা এবং নির্ভরতার সংবাদপত্র হিসেবে। আমরা নির্দি্বধায় বলতে পারি, এক্ষেত্রে সমকাল অবশ্যই অন্য যে কোনো সংবাদপত্র থেকে আলাদা। আমরা নিরন্তর কাজ করে চলেছি জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা। তারুণ্যের শক্তিতে আমরা লড়াই করছি একটি গণমুখী অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনস্কমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায়।

ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরে পা দিয়েছে সমকাল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ মনে হচ্ছে, সময় ও সংবাদপত্রের ধ্রুপদি সম্পর্ক যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংবাদমাধ্যমের বিবর্তনের ইতিহাস যদি দেখি, রোম সাম্রাজ্যের 'আকতা দিউরনা' থেকে আজকের সংবাদপত্র পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছিল পাঁচশ' বছর। সেই তুলনায় একুশ শতকে এসে সংবাদপত্র প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। মার্ক টোয়েনের উপমা মেনে প্রতিদিনের সূর্যোদয়ের মতোই প্রতিদিন সংবাদপত্র প্রকাশ হচ্ছে বটে, তবে এর পরিধি ও প্রাসঙ্গিকতা আর উদয় ও অস্তাচলে সীমিত থাকছে না। সংবাদপত্রকে এখন নতুন করে নতুন ভাবনায় তৈরি ও উপস্থাপন করতে হচ্ছে।

কেবল অনলাইন সংস্করণের কথা বলছি না। টেক্সট, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি মিলিয়ে সংবাদপত্র যে ত্রিমাত্রিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, সে কথাও বলছি না। আমাদের কাছে মনে হয়, সংবাদপত্র এখন অন্তর্গত এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খোলনলচে কমবেশি আগের মতোই থাকছে, কিন্তু এর ভাষা ও ভঙ্গি প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে। বার্তা, সম্পাদকীয়, ফিচারের যে 'টেক্সটবুক তত্ত্ব' দশকের পর দশক সংবাদপত্র শাসন করেছে, এখন তা অচল প্রায়। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবল উপস্থিতি প্রচলিত ধারার সংবাদমাধ্যমের ভিত্তিও নাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবর্তনের এই প্রপঞ্চ যদি প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যেত, আমার মতো নির্ভার আর কেউ হতে পারত না। ছাত্রজীবন থেকে যে সংবাদমাধ্যমে কাজ করে করে বড় হয়েছি; সুনাই-কুশিয়ারা-সুরমা নদীর তীর থেকে বুড়িগঙ্গার পাশে থিতু হয়েছি; এই সংবাদমাধ্যম কি আমার চিরচেনা ব্রডশিট কিংবা আমারই চেতনার রঙে সবুজ হওয়া সেই পান্না? নিজেকেই প্রশ্ন করি, সংবাদপত্রের যে পরিবর্তন, তা কি নিছক লেটার প্রেস থেকে সিটিপিতে রূপান্তর? নিছক টেলিপ্রিন্টার থেকে স্মার্টফোনে বিবর্তন? আমরা বরং দেখছি, সংবাদমাধ্যমের কথা মাথায় রেখেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন নতুন ডিভাইস 'কাস্টমাইজ' করা হচ্ছে। এ যেন প্রতিপূরক ভঙ্গিতে সম্পূরক সত্তা।

বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে আদর্শ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের চলমান পরিবর্তনকে যদি তারই ধারাবাহিকতা বলা যেত, তাতেও স্বস্তি কম ছিল না। আমরা দেখেছি, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের পথ ধরে গণতন্ত্র এসেছিল। গণতন্ত্রে পুঁজির খবরদারির প্রতিক্রিয়ায় এসেছিল সমাজতন্ত্র। আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অনেকাংশে ভেসে গেছে বিশ্বায়নের তোড়ে। সংবাদমাধ্যমের নতুন গতি ও উৎপ্রেক্ষায় বিশ্বায়নও যেন আজ বাতিল বার্তা। আরব বসন্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন, ইরাক-ইরান থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান- আমরা দেখছি, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠছে যুযুধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মাঝে যথার্থ 'তৃতীয় শক্তি'। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সংবাদমাধ্যম আজ অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। আশি বা নব্বইয়ের দশকে সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক আদর্শকে সমর্থন দিত। এখন নিজেই তৈরি করছে রাজনীতির নতুন ন্যারেটিভ। রাজনৈতিক পক্ষগুলো তা অনুসরণও করছে। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সময়ে এসে 'রিয়েল নিউজ' এবং 'ফেইক নিউজ'-এর পার্থক্য নিরূপণেও লড়াই করতে হচ্ছে। এই লড়াইয়েও দায়িত্বশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে আপস করছে না সমকাল।

বিশ্বখ্যাত মিডিয়া তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, 'মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ'। মাধ্যমই বার্তা। সংবাদমাধ্যমের আধেয় বলে আলাদা কিছু নেই। ইন্টারনেট আবিস্কার ও সহজলভ্য হওয়ার তিন দশক আগেই তিনি এই নতুন মাধ্যমের আবিস্কার এবং তার ভিত্তিতে 'গ্লোবাল ভিলেজ' বা বিশ্বগ্রাম তৈরির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। আজকের সংবাদমাধ্যম কেবল ওয়ার্ল্ডওয়াইডওয়েবের অংশ হিসেবে বিশ্বগ্রামের সদস্য নয়, বরং নিজে নিজেই যেন তৈরি করছে এক একটি বিশ্ব। এই বিশ্ব যেমন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, তেমনই সদা স্থির। এ এক নতুন সময়, নতুন পরিস্থিতি। আমাদের সংবাদমাধ্যম আগে কখনও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। নতুন দিনে নতুনভাবে স্বপ্ন না দেখলে কীভাবে সম্ভব এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া?

নতুনের কেতন উড়তে দেখলে নাকি জয়ধ্বনি করতে হয়। সংবাদমাধ্যমের এই নতুন দিনে আমরা কি সেই পরামর্শ মেনে জয়ধ্বনি করব? আমরা নতুনতর প্রতিজ্ঞায় নতুনকে আবাহনের পক্ষে। সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন সামনে রেখে আমি ও আমার সহকর্মীরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- আমরা নতুন কিছু করবই। নতুন পরিস্থিতিতে আমরা উৎকণ্ঠিত নই, বরং উদ্দীপ্ত। সমকাল পরিবার ইতিমধ্যেই এক ঝাঁক নতুন ধারণা চর্চা করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তা পাখা মেলবার অপেক্ষায়। নতুন দিনে নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন সমকাল হবে বাংলা ভাষার সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পত্রিকা। পাঠকের মন জোগাতে ও মন জাগাতে সর্বসাধ্য নিয়োগ করব- এ আমাদের অঙ্গীকার।

সংবাদপত্রের এই নতুন পরিস্থিতি সমকালের জন্য নতুন নয় এ কারণে যে, দেড় দশক আগে আমরা এমন সময় বাজারে এসেছিলাম, যখন পরিবর্তনের ঢেউ আমাদের এই অঞ্চলে সবে লাগতে শুরু করেছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে এই বাংলাদেশেই কত সংবাদপত্র মিইয়ে গেছে, এমনকি মিলিয়েও গেছে। সমকাল কিন্তু তাল মিলিয়ে মিলিয়ে, খাপ খাইয়ে খাইয়ে অগ্রসর হয়েছে। এক্ষেত্রে আমার পূর্বসূরি সম্পাদকগণ, বিশেষত প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের অবদান আজ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে। তার ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী হিসেবে আমি দেখেছি, বয়সে প্রবীণ হয়েও তিনি মননে কতটা তরুণ ছিলেন। নতুন যুগের চাহিদার সঙ্গে সমকালকে বদলে দিতে তিনি কীভাবে নবীন সহকর্মীদের ওপর আস্থা রেখেছেন। পরিবর্তনের পথযাত্রী হওয়ায় সমকালের সেই আজন্ম আকাঙ্ক্ষা আমরাও লালন এবং পালন করতে চাই।

সমকাল পরিবারের নতুন-পুরনো সব সহকর্মীর ওপর আমি আস্থাশীল। আমাদের প্রকাশক এ. কে. আজাদ সমকাল ঘিরে যে স্বপ্ন দেখেন, তা আমার এবং আমাদেরও স্বপ্ন। একটি পাঠকনন্দিত, দায়িত্বশীল দৈনিক আমাদের সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার স্বতঃস্ম্ফূর্ত আকাশ। আশা করি, নতুন বাস্তবতায় সমকালের নতুন বিভা ছড়িয়ে দিতে আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে পত্রিকাকে এগিয়ে নিয়ে যাব। দেড় দশক থেকে সময় পরিক্রমায় সমকাল যখন দেড়শ' বছর পূর্ণ করবে, তখনও নিশ্চয় আমাদের যূথবদ্ধ অবদানের কথা স্মরণ করবে অনাগত উত্তরসূরিরা। সেই সময়টিতেও আমাদের প্রিয় পত্রিকাটি যেন মানুষের কথা বলে। দেশের কথা বলে। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চেতনায় আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে।

আমরা জানি, প্রবীণ মহিরুহও নতুন কুঁড়ির জন্ম দেয়। নতুন কুঁড়িও কালে কালে হয়ে ওঠে নতুন মহিরুহ। সমকাল তার প্রতিষ্ঠার দেড় দশকে যেমন ক্রমেই মহিরুহ হয়ে উঠেছে, তেমনই জন্ম দিয়েছে অসংখ্য নতুন কুঁড়ির। আগামী দিনগুলোতে তার ফুল ও ফল সৌরভ ও সৌন্দর্য ছড়াতে থাকবে, আমরা নিশ্চিত। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন সামনে রেখে আমাদের দায়িত্ব এসব কুঁড়ির যত্ন নেওয়া এবং আরও নতুন কুঁড়ির জন্ম দেওয়া।

এই শুভলগ্নে সমকালের পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মী, সহযোদ্ধাদের শুভেচ্ছা জানাই। আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাগত জানাই নতুন দিনের নতুন সমকালে।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )


অনলাইন বিজ্ঞাপন