পুরান ঢাকার বিরিয়ানীর ইতিবৃত্ত

প্রকাশিত: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:৩৭:৪৮ | আপডেট: ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:৩৭:৪৮ 3
পুরান ঢাকার বিরিয়ানীর ইতিবৃত্ত

বিরিয়ানি বা কাচ্চি, ফালুদা বা লাচ্ছি, কিংবা বাকরখানি- এইসব বাহারি খাবারের স্বাদ নিতে পুরান ঢাকায় ছুটে আসেন দেশ-বিদেশ হতে বহু মানুষ। পুরান ঢাকার নানা স্থাপনার পাশপাশি বাহারি সকল খাবার পুরান ঢাকাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে লোকমুখে।
পুরান ঢাকার কাচ্চির গল্প শুনে কারো জিভে জল আসে না এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, পূর্বের গোটা ভারতবর্ষ তথা ভারত কিংবা বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, বাহরাইন, ব্রুনেই, মায়ানমার, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুর্দিস্তান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলংকাসহ অনেক দেশেই এই কাচ্চি পাওয়া যায়। প্রায় চারশ বছর থেকে বাংলায় রাজত্ব করে আসছে মুঘল খাদ্যভাণ্ডারের সুস্বাদু এই খাবারটি। ৪০০ বছরেও এর কোন কদর কমেনি।

ইতিহাস ঘেটে এবং লোকমুখে জানা যায়, বিরিয়ানি শব্দের উৎপত্তি ফারসি 'বিরিয়ান' শব্দ থেকে। ফারসিতে বিরিয়ান শব্দের অর্থ রান্নার আগে ভেজে নেওয়া। দেখা যায় যে, বিরিয়ানি রান্নার আগে সুগন্ধি চাল ঘি দিয়ে ভেজে নেওয়া হয়। তাই এই খাবারের নামকরণ করা হয় বিরিয়ানি।

জনশ্রুতি আছে, একদা রানী মমতাজ মুঘল সৈন্যদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে সৈন্যদের ব্যারাকে গেলেন। কিন্তু রানী দেখতে পেলেন সৈনিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়। তাই সৈনিকদের মেসের বাবুর্চিকে নির্দেশ দিলেন চাল ও গোশত সমৃদ্ধ এমন একটা পুষ্টিকর খাবার তৈরি করতে, যেটা সৈনিকদের খারাপ স্বাস্থ্যে উন্নতি করে দিতে পারে। রানী মমতাজ মহলের আদেশে বাবুর্চি যে খাবারটি তৈরি করলেন সেটাই আজকের দিনের বিরিয়ানি নামে পরিচিত।

বিরিয়ানির চাল কখনও কখনও সিদ্ধ করা হয় না। বিরিয়ানির চাল সবসময়েই লম্বা বা চিকন প্রকারের যেমন- বাসমতী বা কালিজিরা চাল। বিরিয়ানির চাল প্রথমে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া হয়। তারপর তা বেশ কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর চালে গরম মশলা মেশানো হয়। ম্যারিনেট করা মাংসের বড় টুকরো মুরগি হোক বা খাসি বা গরু‌‌ হোক, চালে মেশানো হয়।

হাঁড়িতে চাল ও মাংস এক এক করে সাজিয়ে রাখা হয়, দুটি স্তরের মধ্যে ঘি মিশিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও নানারকম মশলা মেশানো হয়। শেষে হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিরিয়ানিতে আলু, আলুবোখরা ও দই ব্যবহার করা হয়।

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের হাজি বিরিয়ানি বিশেষভাবে নামকরা। হাজীর বিরিয়ানি ১৯৩৯ সালে হাজী গোলাম হোসেন সাহেবের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে। এটি এখনো সকলের প্রথম পছন্দ। এ ছাড়াও নাজিরাবাজারের নবাব বিরিয়ানি, হানিফ বিরিয়ানি, সুলতানস ডাইন, চানখাঁর পুলের হাজী নান্নার বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানিসহ আরও অসংখ্য বিরিয়ানি ঘর গড়ে উঠেছে নতুন ও পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে। এসব দোকানগুলোতে এদের মধ্যে ঢাকাই বিরিয়ানি, সিন্ধী, হায়দারাবাদী, বোম্বাই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পুরান ঢাকায় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হল কাচ্চি বিরিয়ানি। কাচ্চি শব্দটা এসেছে উর্দু 'কাচ্চা' শব্দটি থেকে যার বাংলা প্রতিশব্দ কাঁচা। কাচ্চি বিরিয়ানিতে সুগন্ধি চালের সাথে গোশত সরাসরি রান্না করা হয়, সে কারণেই এর নাম কাচ্চি বিরিয়ানি। এটি হিন্দি এবং উর্দুতেও একই নামে পরিচিত। সেদ্ধ ছাড়া খাসির গোশত টকদই দিয়ে মাখিয়ে তার ওপর আলু আর চাল মিশিয়ে রান্না করা হয় কাচ্চি বিরিয়ানি।

এইসব দোকানগুলাতে কাচ্চির দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাথে বোরাহানির দাম ২৫ টাকা গ্লাস থেকে শুরু করে ৪০ টাকা গ্লাস পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিরিয়ানির পাশাপাশি এইসব দোকানে তেহারী এবং মোরগপোলাও পাওয়া যায়।
কাচ্ছি খেতে আসা রুমান বলেন, আমি কুমিল্লা থেকে এসেছি পুরান ঢাকার এইসব কাচ্চির স্বাদ নিতে। গতকাল হাজীর বিরিয়ানি খেয়েছিলেম। আজ এসেছি নবাব বিরিয়ানী খেতে। এখানকার খাবারগুলো সারা বাংলায় তাদের সি-স্বাদের জন্য বিখ্যাত। পুরান ঢাকার কাচ্চি/বিরিয়ানির সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না।

আফজাল নামের এক কাচ্চি বিক্রেতা বলেন, প্রতিদিন অনেক কাস্টমার আসে। বিশেষ দিলগুলাতে মানুষের চাপ খুব বেশি থাকে। তখন খুব হিমশিম খেতে হয়। বাংলাদেশ এবং কলকাতাসহ বিভিন্ন জায়গায় মানুষ এখানে খেতে আসেন। আগের চেয়ে বিক্রি কমেনি বরং দামটা একটু বাড়িয়েছি। আমাদের সব জিনিসিপত্রের দাম এখন অনেক বেড়েছে। কাচ্চির পাশাপাশি আমাদের তেহেরী, মোরগপোলাও খুব হয়। তবে কাচ্চির কাস্টমার বেশি।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )