যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পরিণতি কী?

প্রকাশিত: ৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:৩২:০০ | আপডেট: ৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:৩৪:৩৭ 42
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পরিণতি কী?

ইরান সদর্পে ঘোষণা দিয়ে ইউরেনিয়াম আহরণ জোরালো করেছে। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সম্প্রতি এ ঘোষণা দিয়েছেন। একগুঁয়ে ইরানের এই পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও কঠোর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় এলাকায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে।

সংঘাত যেভাবে শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নতুন নয়। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চলছে। শাহদের শাসনামলে এই পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে অনেক দিন ধরেই ইরানের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ তেলের ওপর বিরাট ভাগ বসিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে ছিল যুক্তরাজ্য।

১৯৫১ সালে ইরানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেলসম্পদকে জাতীয়করণের একটা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। পশ্চিমা দেশে শিক্ষিত মোসাদ্দেক ছিলেন সাহসী ও বুদ্ধিমান। মার্কিন ও ব্রিটিশরা পড়ে গেল সমস্যায়। ভাবল, এই প্রধানমন্ত্রী তাদের স্বার্থ তো দেখবেনই না, বরং এতে কুড়াল চালাবেন। গোপন সলাপরামর্শে বসে গেল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস। উদ্দেশ্য একটাই—মোসাদ্দেককে উৎখাত করে পশ্চিমা স্বার্থ-সহায়ক নতুন নেতা নিয়ে আসা। পরে যে অভ্যুত্থানটি ঘটানো হলো, এর সাংকেতিক নাম ‘অপারেশন পিটি-অ্যাজাক্স’। এতে পতন হলো মোসাদ্দেকের।

১৯৫৩ সালের আগস্টে এলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি। তাঁর সরকার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, কমিউনিস্টবিরোধী ও পশ্চিমাপন্থী। কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তার বিনিময়ে ইরানের তেলসম্পদের মোট মজুতের ৮০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের হাতে তুলে দেয় এই সরকার।

ইরানে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বেশির ভাগ ইরানি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি। জনরোষ ক্রমে শাহ পরিবারের দিকে ধাবিত হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী রেজা শাহ নিজের অবস্থান মজবুত করতে কঠোর অবস্থান নেন। ‘সাভাক’ নামে তাঁর একটি গোপন পুলিশ বাহিনী ছিল। হাজার হাজার মানুষকে তারা নির্যাতন করে, নৃশংসভাবে হত্যা করে।

 

প্রধানমন্ত্রী রেজা শাহকে এ সময় প্রতিরক্ষাব্যূহ সুরক্ষিত করার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। শাহ সরকার কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে থাকে। অর্থের এই শ্রাদ্ধ ইরানের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দেয়। ফুঁসে ওঠে জনরোষ। দেশব্যাপী শুরু হয় বিপ্লব। ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে এই বিশাল বিপ্লবে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পতন হয় রেজা শাহর। ক্ষমতা হারিয়ে সপরিবার দেশ ছাড়েন তিনি।

 

এর কয়েক মাস পর, ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় যান শাহ। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় তিনি এ সুযোগ পান। ইরান তা ভালোভাবে নেয়নি। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর একদল ইরানি ছাত্র ঝোড়ো বেগে তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে পড়েন। ৬০ জনের বেশি কর্মীকে জিম্মি করে ফেলা হয়।

এ ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত শাহকে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হয়। কার্টার অনেক চেষ্টা করেও তেহরানের ওই ঘটনার কোনো সমাধান করতে পারেননি। এমনকি ‘অপারেশন ইগল ক্ল’ নামের একটি ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানও ঘটনাক্রমে ব্যর্থ হয়। ইরানি ছাত্ররা কিছু মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত ৫২ জন জিম্মি হিসেবে থেকে যায়।

এ ঘটনায় মার্কিন নাগরিকেরাও কার্টারের ওপর আস্থা হারায়। পরবর্তী নির্বাচনে সদর্পে ক্ষমতায় আসেন রিপাবলিকান প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যান। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে রিগ্যান ক্ষমতায় আসার পর তেহরানের মার্কিনবিরোধী মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে।

১৯৮১ সালের ২১ জানুয়ারি রিগ্যান উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর খোমেনির নির্দেশে ছাত্ররা ছেড়ে দেন জিম্মি করা মার্কিন নাগরিকদের। তত দিনে পার হয়ে গেছে ৪৪৪ দিন।

ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত শাহকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার কারণেই যে শুধু তেহরানে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করা হয়, তা নয়। মার্কিনদের ওপর ইরানিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে ওই ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের টানাপোড়েন মূলত তখন থেকেই দৃশ্যমান।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )


অনলাইন বিজ্ঞাপন